কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জগতে নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন জার্মান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্যাক্সন কিউ-এর গবেষকেরা। হীরার ভেতরের অতি ক্ষুদ্র ও পরিকল্পিত ত্রুটিকে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করে এমন একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ব্যবস্থা তৈরির দাবি করা হয়েছে, যা প্রচলিত ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তির মতো অত্যন্ত কম তাপমাত্রার পরিবেশ ছাড়াই কাজ করতে পারে।
গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, নতুন এই প্রযুক্তি স্বাভাবিক বা ঘরের তাপমাত্রায় পরিচালনা করা সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, বিশেষ ধরনের এই কোয়ান্টাম সিস্টেম সাধারণ কম্পিউটারের মতো সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগে চালানো এবং প্রচলিত সার্ভার র্যাকে স্থাপন করাও সম্ভব হতে পারে। ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তিকে গবেষণাগারের সীমা থেকে বাস্তব প্রয়োগের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারে কিউবিট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সাধারণ কম্পিউটারে তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের মৌলিক একক হলো বিট। একটি বিট সাধারণত ০ অথবা ১—এই দুটি অবস্থার একটি ধারণ করে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে ব্যবহৃত কিউবিট বা কোয়ান্টাম বিটের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন।
কিউবিট কোয়ান্টাম সুপারপজিশনের কারণে একই সময়ে একাধিক সম্ভাব্য অবস্থার সমন্বয় ধারণ করতে পারে। এর ফলে নির্দিষ্ট ধরনের জটিল সমস্যা প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে সমাধান করার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তবে কিউবিট তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। বিভিন্ন ধরনের কোয়ান্টাম কম্পিউটারে কিউবিট স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ পরিবেশ প্রয়োজন হয়। এখানেই হীরাভিত্তিক কিউবিট প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হীরার ত্রুটিই যখন কিউবিট
নতুন প্রযুক্তির অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হলো কৃত্রিম হীরার ব্যবহার। সাধারণভাবে হীরাকে অত্যন্ত নিখুঁত ও ত্রুটিমুক্ত একটি উপাদান হিসেবে দেখা হলেও গবেষকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে এর গঠনে নির্দিষ্ট ত্রুটি তৈরি করছেন।
এই ত্রুটিকে বলা হয় নাইট্রোজেন-ভ্যাকেন্সি বা NV সেন্টার। হীরার কার্বন কাঠামোর নির্দিষ্ট একটি স্থানে কার্বনের পরিবর্তে নাইট্রোজেন পরমাণু বসানো হয় এবং তার পাশে একটি খালি স্থান রাখা হয়। এই বিশেষ পারমাণবিক কাঠামোর ইলেকট্রনের স্পিন নিয়ন্ত্রণ করে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
লেজার এবং মাইক্রোওয়েভ পালসের মাধ্যমে এসব কিউবিটের কোয়ান্টাম অবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে হীরার একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ত্রুটি হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত উন্নত কোয়ান্টাম তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
প্রযুক্তিতে সালফারের ভূমিকা
NV সেন্টারভিত্তিক কিউবিট প্রযুক্তি নতুন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে বড় সংখ্যক কিউবিট একসঙ্গে পরিচালনা করা এই প্রযুক্তির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
স্যাক্সন কিউ-এর গবেষণায় হীরার মধ্যে নাইট্রোজেন-ভ্যাকেন্সির পাশাপাশি সালফার যুক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, সালফার প্রয়োজনীয় ইলেকট্রন সরবরাহ এবং কিউবিট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মারিয়ুস গ্রুন্ডমান এই পদ্ধতিকে তাদের প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিউবিটের নির্ভুলতায় অগ্রগতি
স্যাক্সন কিউ-এর দাবি অনুযায়ী, ত্রুটি সংশোধনের আগে তাদের কিউবিটের ফিডেলিটি বা নির্ভুলতা ৯৯.৯২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। পরবর্তী পরীক্ষায় একক কিউবিটের ক্ষেত্রে এই হার ৯৯.৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এর অর্থ হলো, কোয়ান্টাম অপারেশনের সময় ভুলের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে এই ফলাফল এখনো স্বাধীন গবেষণা বা তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি। তাই অন্যান্য কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কেন ঘরের তাপমাত্রায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বহুল ব্যবহৃত কিছু প্রযুক্তি, বিশেষ করে সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট, অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় পরিচালনা করতে হয়। এ জন্য বিশেষ ক্রায়োজেনিক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়, যা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে হীরাভিত্তিক NV কিউবিট ঘরের তাপমাত্রায় কাজ করতে পারলে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অবকাঠামো অনেক সহজ হতে পারে। গবেষকদের দাবি, তাদের সিস্টেম সাধারণ কম্পিউটার র্যাকে স্থাপন করা সম্ভব এবং সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েও চালানো যায়।
এ ধরনের বৈশিষ্ট্য কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে শুধু বড় গবেষণাগার নয়, বরং ভবিষ্যতে বিভিন্ন বাস্তব পরিবেশে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ও রোবটে ব্যবহার হতে পারে
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো এজ কম্পিউটিং। কোনো ডেটা দূরের ক্লাউড সার্ভারে পাঠিয়ে ফলাফল পাওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় ডিভাইসেই যদি জটিল গণনা করা যায়, তাহলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, রোবট, শিল্পকারখানার স্মার্ট যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে যেসব কাজে খুব অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, সেখানে স্থানীয় কোয়ান্টাম প্রসেসিং ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১২৮ থেকে ৫১২ কিউবিটের লক্ষ্য
স্যাক্সন কিউ জানিয়েছে, তারা র্যাক-মাউন্টেড কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেমে ১২৮ কিউবিট পর্যন্ত ব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আরও বড় কিউবিট সিস্টেম তৈরির বিষয়ও রয়েছে।
আগামী ধাপে ৫১২ কিউবিটের সংস্করণ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে তাদের লক্ষ্য ১০ হাজার বা তার বেশি কিউবিটে পৌঁছানো।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রযুক্তিগত বাধাও কম নয়।
বড় চ্যালেঞ্জ কিউবিটের ঘনত্ব
বর্তমানে একটি চিপে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক কিউবিট রাখা সম্ভব। গবেষকদের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই চিপে শত শত কিংবা হাজার হাজার কিউবিটকে কার্যকরভাবে সাজানো এবং নিয়ন্ত্রণ করা।
কিউবিটের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ, নিয়ন্ত্রণ এবং ত্রুটি কমিয়ে রাখা প্রয়োজন। ফলে কেবল বেশি কিউবিট তৈরি করলেই হবে না; পুরো সিস্টেমের স্থিতিশীলতা ও নির্ভুলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
গতির দিক থেকেও প্রতিযোগিতা রয়েছে
ঘরের তাপমাত্রায় কাজ করতে পারা হীরাভিত্তিক কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বড় সুবিধা হলেও এটিই সবকিছু নয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কার্যক্ষমতা নির্ধারণে গতি, কিউবিটের মান, ত্রুটির হার, স্কেলিং এবং নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা—সবগুলো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্দিষ্ট অপারেশনে হীরাভিত্তিক NV কিউবিটের তুলনায় দ্রুত হতে পারে। ফলে নতুন প্রযুক্তিকে এখনই সব ধরনের কোয়ান্টাম কম্পিউটারের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বলে ঘোষণা করার সুযোগ নেই।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে নতুন সম্ভাবনা
হীরার ক্ষুদ্র ত্রুটিকে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করে ঘরের তাপমাত্রায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার পরিচালনার ধারণা প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে অত্যন্ত কম তাপমাত্রার প্রয়োজন না হলে ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের আকার, অবকাঠামো এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে প্রযুক্তিটি এখনো বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। কিউবিটের সংখ্যা বাড়ানো, প্রসেসিং গতি উন্নত করা, ত্রুটি নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনভাবে গবেষণার ফলাফল যাচাই—এসব ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, হীরার ‘ত্রুটি’কে কাজে লাগিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংকে স্বাভাবিক পরিবেশে নিয়ে আসার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের কম্পিউটিং প্রযুক্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার দিক হতে পারে।
Comments