দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে আগামী ডিসেম্বর থেকে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কার্যক্রমের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে রাজধানী ঢাকায় কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করাই হবে এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, ক্যারিয়ার প্রস্তুতি এবং দেশ-বিদেশের চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ডিসেম্বরে ঢাকায় শুরু প্রাথমিক কার্যক্রম
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি জানান, বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে ডিসেম্বর থেকে ঢাকায় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ ও ক্যারিয়ার ফেয়ারের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। পর্যায়ক্রমে এই উদ্যোগ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে গত ছয় মাসে সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতাকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে চাকরিপ্রার্থীদের যোগ্যতার সমন্বয় ঘটানো। এ জন্য প্রার্থীদের দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জনবলের চাহিদার তথ্যও সংগ্রহ করা হবে।
এই তথ্যগুলোকে একত্র করে একটি জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রয়োজনীয় জনবল খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পাবে এবং চাকরিপ্রার্থীরাও নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজতে পারবেন।
নতুন গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির বাজারে যুক্ত করার লক্ষ্য
সরকারের এই উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তরুণদের ওপর। মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা যুবক এবং সদ্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ করা তরুণদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা প্রয়োজন। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।
নিয়মিত ক্যারিয়ার ফেয়ার আয়োজন
চাকরির সুযোগ তৈরির পাশাপাশি দেশব্যাপী নিয়মিত ক্যারিয়ার ফেয়ার আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। জেলা পর্যায়ে এসব আয়োজনের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার আগেই চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
সিভি লেখা ও চাকরির ইন্টারভিউয়ের প্রশিক্ষণ
শুধু চাকরির সঙ্গে প্রার্থীদের যুক্ত করাই নয়, চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের আওতায় সম্ভাব্য চাকরিপ্রার্থীদের জন্য—
- সঠিকভাবে সিভি তৈরির প্রশিক্ষণ
- পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন
- চাকরির সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি
- প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ
- নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ
তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থাও থাকবে।
বিদেশে যেতে আগ্রহীদের জন্যও থাকছে সুযোগ
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ শুধু দেশের চাকরির বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে আগ্রহী তরুণ-তরুণীদেরও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিবন্ধনের পর বিদেশে চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা অর্জনে আগ্রহীদের সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
এ ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থী এবং চাকরিদাতা—উভয় পক্ষই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন।
কর্মসংস্থানের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ডিসেম্বরেই জানানো হবে
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কতসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে—এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ করা হয়নি।
মাহদী আমিন জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সময় উদ্যোগটির বিস্তারিত রোডম্যাপ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য প্রকাশ করা হবে।
তিনি বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতা উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পুরো কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
কারখানা বন্ধ ও নতুন বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কলকারখানা বন্ধ এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন করা হয়।
এ বিষয়ে মাহদী আমিন জানান, ৫ আগস্টের পর কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে যে পরিমাণ কারখানা বন্ধের তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তব সংখ্যা তার তুলনায় কম।
কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়লেও একই সময়ে নতুন বিনিয়োগ আসছে এবং নতুন কারখানাও চালু হচ্ছে বলে তিনি জানান। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
আপাতত দক্ষতা উন্নয়নেই বেশি গুরুত্ব
তরুণদের জন্য ভবিষ্যতে বেকার ভাতা চালুর কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি ভবিষ্যতে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে বর্তমান পর্যায়ে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ বেকার ভাতার পরিবর্তে আপাতত তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চাকরির বাজারে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ?
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগদাতার প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং চাকরিপ্রার্থীদের যোগ্যতার মধ্যে ব্যবধান দেখা যায়। ফলে একদিকে চাকরির সুযোগ থাকলেও অন্যদিকে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে যদি চাকরিপ্রার্থীদের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগদাতাদের চাহিদার তথ্য কার্যকরভাবে সমন্বয় করা যায়, তাহলে এই ব্যবধান কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, নিয়মিত ক্যারিয়ার ফেয়ার এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে তরুণদের চাকরির বাজারে প্রবেশের পথ আরও সহজ হতে পারে।
ডিসেম্বরেই মিলবে বিস্তারিত রোডম্যাপ
সব মিলিয়ে, চাকরিপ্রার্থীদের জন্য প্রস্তাবিত এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ হতে যাচ্ছে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার একটি উদ্যোগ। ডিসেম্বর থেকে ঢাকায় এর প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পরে পর্যায়ক্রমে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
উদ্যোগটির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো, কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সময় প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
Comments