মহাকাশের দূরবর্তী ও শক্তিশালী উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে স্থাপিত আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি গড়ে তোলা ও এর গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের নতুন পথ উন্মুক্ত করার জন্য তাকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে। ৮২ বছর বয়সী ফ্রান্সিস হালজেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সঙ্গে যুক্ত।
নিউট্রিনো গবেষণায় হালজেনের বড় অবদান
নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সিস হালজেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের একটি বড় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এমন একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে মহাবিশ্বকে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স বলেন, হালজেনের দীর্ঘ অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন একটি ধারার ভিত্তি তৈরি করেছে।
হালজেনের গবেষণার বিশেষত্ব হলো, তিনি মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনাবলি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলোর পরিবর্তে নিউট্রিনোকে ব্যবহার করার পথকে আরও শক্তিশালী করেছেন।
নিউট্রিনো কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
নিউট্রিনো হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র, বৈদ্যুতিকভাবে নিরপেক্ষ একটি মৌলিক কণা। এটি সাধারণ পদার্থের সঙ্গে খুব দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে বিপুল পরিমাণ পদার্থের মধ্য দিয়েও নিউট্রিনো প্রায় বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারে।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই মহাবিশ্বের অত্যন্ত দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা নিউট্রিনো বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস।
মহাকাশে বিস্ফোরণ, অত্যন্ত শক্তিশালী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু কিংবা অন্যান্য উচ্চশক্তির মহাজাগতিক ঘটনার সময় উৎপন্ন নিউট্রিনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। এসব কণা শনাক্ত করতে পারলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও রহস্যময় ঘটনাগুলো সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া সম্ভব।
দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে বিশাল নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগার
ফ্রান্সিস হালজেনের নিউট্রিনো শনাক্তকরণ নিয়ে গবেষণার শুরু ১৯৮০-এর দশকে। তখন থেকেই পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম পরিবেশ দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্ত করার কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে কাজ করে আসছেন তিনি।
এই দীর্ঘ গবেষণার অন্যতম বড় ফল হলো আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
দক্ষিণ মেরুর বরফের প্রায় দেড় কিলোমিটার গভীরে স্থাপন করা হয়েছে আইসকিউবের বিশেষ সেন্সর। বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত স্বচ্ছ বরফের মধ্যে এসব সেন্সর নিউট্রিনোর কারণে সৃষ্ট অত্যন্ত ক্ষীণ আলোর সংকেত শনাক্ত করে।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনোর পাশাপাশি আইসকিউবের মাধ্যমে দূরবর্তী মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনোও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণে খুলেছে নতুন জানালা
এতদিন মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা প্রধানত আলো এবং অন্যান্য তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণের ওপর নির্ভর করেছেন। নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এখন সেই প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি তথ্যের উৎস যুক্ত হয়েছে।
নোবেল কমিটির মতে, নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে।
এর ফলে মহাজাগতিক এমন কিছু ঘটনা ও উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে, যেগুলো শুধুমাত্র আলো পর্যবেক্ষণ করে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। নিউট্রিনো সরাসরি মহাজাগতিক উৎস থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারে বলে এগুলো সেই উৎসের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে।
নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য কত?
এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
নোবেল পুরস্কার একজন বিজ্ঞানী, একাধিক বিজ্ঞানীর ছোট দল কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেও দেওয়া হতে পারে।
শুরু হয়েছে এবারের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবারের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয়েছে। এরপর পদার্থবিজ্ঞানে ফ্রান্সিস হালজেনের পুরস্কার পাওয়ার খবর সামনে আসে।
নোবেল পুরস্কারের ধারাবাহিকতায় বুধবার রসায়নে, বৃহস্পতিবার সাহিত্যে এবং শুক্রবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এরপর আগামী সোমবার অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।
ফ্রান্সিস হালজেনের নোবেল পাওয়ার গুরুত্ব
ফ্রান্সিস হালজেনের পুরস্কার শুধু একজন বিজ্ঞানীর দীর্ঘ গবেষণার স্বীকৃতি নয়; এটি নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান নামের একটি নতুন গবেষণা ক্ষেত্রের গুরুত্বকেও তুলে ধরে। দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে স্থাপিত আইসকিউব পর্যবেক্ষণাগারের মাধ্যমে মহাবিশ্বকে দেখার যে নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আলো দিয়ে মহাবিশ্বকে দেখার পাশাপাশি নিউট্রিনোর মাধ্যমে মহাবিশ্বকে বোঝার এই নতুন পদ্ধতি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
Comments