সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। অবশেষে ১০ম গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এ জন্য বেতন নির্ধারণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-২ অনুবিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। আদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে নির্ধারণের পদ্ধতি আইবাস++ সফটওয়্যারে সংযুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকদের বেতন হবে ১০ম গ্রেডে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই নতুন গ্রেড অনুযায়ী বেতন পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন শিক্ষকরা। প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে এতদিন নতুন গ্রেডে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
নতুন নির্দেশনার ফলে ১১তম গ্রেডে থাকা প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেড অনুযায়ী নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হলো। বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি আইবাস++-এ যুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা নতুন গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন।
১০ম গ্রেডে কত টাকা বেতন?
নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী ১০ম গ্রেডের মূল বেতন ৩২ হাজার টাকা থেকে শুরু হবে। ধাপে ধাপে তা সর্বোচ্চ ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে।
তুলনামূলকভাবে আগের বেতন কাঠামোয় ১০ম গ্রেডের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা পর্যন্ত ছিল।
প্রধান শিক্ষক পদ ১০ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১১তম ও ১২তম গ্রেডের বেতন কাঠামো কার্যকর ছিল। নতুন বেতন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা থেকে এবং ১২তম গ্রেডের মূল বেতন ২৪ হাজার ৩০০ টাকা থেকে শুরু হয়।
বকেয়া বেতন পাবেন কি প্রধান শিক্ষকরা?
১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বকেয়া বেতন। নতুন আদেশে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আদেশ অনুযায়ী, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি আদেশ বা জিও (Government Order) জারির তারিখের আগের সময়ের কোনো আর্থিক বকেয়া প্রধান শিক্ষকরা পাবেন না।
অর্থাৎ, জিও জারির আগে থেকেই ১০ম গ্রেড কার্যকর ধরে যে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা পাওনা হয়েছে বলে ধরা হচ্ছিল, সেই সময়ের আর্থিক বকেয়া দেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
আদালতের রায়ের পর গ্রেড উন্নীত করার প্রজ্ঞাপন
আদালতের রায়ের পর ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১০ম করার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তবে প্রজ্ঞাপন জারির পরও নতুন গ্রেড অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক এবং কারিগরি জটিলতা ছিল। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রধান শিক্ষকদের।
সর্বশেষ অর্থ বিভাগের নির্দেশনার মাধ্যমে আইবাস++-এ নতুন বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি সংযুক্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড বাড়ানোর দাবি এখনো অনিশ্চিত
প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বাড়ানোর দাবিতে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন। নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী এই গ্রেডে মূল বেতন ২৪ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়।
সহকারী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বেতন গ্রেড উন্নীত করার দাবি রয়েছে। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৩তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার একটি প্রস্তাব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় বেতন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল।
তবে এ বিষয়ে বেতন কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। একই সঙ্গে প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ বিভাগেও পাঠানো হয়েছিল।
সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড বাড়লে বাড়বে সরকারি ব্যয়
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড দুই ধাপ বাড়িয়ে ১১তম গ্রেড করা হলে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা হলে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের বর্ধিত গ্রেডে বেতন দিতে সরকারের বছরে প্রায় ৮৩১ কোটি ৯১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নীত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কতটি?
দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।
সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩ লাখ ৬৯ হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে বর্তমানে সাড়ে ৩ লাখের বেশি সহকারী শিক্ষক কর্মরত আছেন।
এ ছাড়া সম্প্রতি প্রায় ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের আগামী ১১ অক্টোবর পদায়নের কথা রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকদের জন্য নতুন সিদ্ধান্তের গুরুত্ব
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি কার্যকর করার উদ্যোগকে সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন গ্রেড অনুযায়ী বেতন পাওয়ার পথ এখন অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে।
তবে জিও জারির আগের সময়ের বকেয়া বেতন না দেওয়ার নির্দেশনার কারণে এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার দাবি এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
Comments