বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশিদের দক্ষতা বাড়ানো ও প্রয়োজনীয় ভাষা শেখার খরচ মেটাতে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ উদ্যোগের আওতায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশগামী কর্মীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ নিতে পারবেন।
বিদেশে যাওয়ার আগে কিংবা গন্তব্য দেশে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ভাষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অনেকের আর্থিক চাপ কমতে পারে।
১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল
বাংলাদেশ ব্যাংক এ কর্মসূচির জন্য মোট ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে। নির্ধারিত অর্থ একবারে দেওয়া হবে না। পাঁচ ধাপে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে অর্থ সরবরাহ করা হবে।
প্রতিটি ধাপে ২০০ কোটি টাকা করে দেওয়া হবে। একটি ধাপের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার পর পরবর্তী ধাপের অর্থ ছাড় করা হবে।
সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ
এই স্কিমের আওতায় একজন আবেদনকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের জন্য কোনো সম্পত্তি বা অন্য কোনো জামানত দিতে হবে না।
তবে ঋণ নিতে দুইজন গ্যারান্টর প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে একজন হতে হবে আবেদনকারীর পরিবারের নিকটতম সদস্য। অন্যজন এমন ব্যক্তি হতে হবে, যিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রয়োজনে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা রাখেন।
সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ
ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণভাবে ঋণের প্রাথমিক মেয়াদ থাকবে তিন বছর।
এ ঋণের সঙ্গে ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে। প্রয়োজন ও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কোন খাতে ঋণের টাকা ব্যবহার করা যাবে?
বিদেশে চাকরির জন্য যাওয়া কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষার খরচ মেটাতে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শেখার কোর্স এবং চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের টিউশন ফি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানের সময় থাকা ও খাওয়ার খরচও এই ঋণের আওতায় আসতে পারে।
তবে বিমানের টিকিটের খরচ এই ঋণ থেকে দেওয়া হবে না।
কারা এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন?
যেসব বাংলাদেশি বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যেতে চান, তারা এ সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবেন।
সরকারি কিংবা অনুমোদিত বেসরকারি বৈধ মাধ্যমে বিদেশে চাকরিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া ব্যক্তিরা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অভিবাসন ঋণ নীতিমালার আওতায় এ ঋণের জন্য বিবেচিত হতে পারেন।
তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা পড়াশোনার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীরা এই স্কিমের সুবিধা পাবেন না।
আবেদনের জন্য কী কী কাগজ লাগবে?
ঋণের আবেদন করতে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বৈধ পাসপোর্ট
- সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা
- সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি বা প্রয়োজনীয় যোগ্যতার প্রমাণ
- ভাষা প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের যোগ্যতার সনদ
- প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফার লেটার
অফার লেটারে প্রশিক্ষণের টিউশন ফি, কোর্সের মেয়াদ এবং থাকা-খাওয়ার ব্যয় সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে করা যাবে ঋণের আবেদন
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ ঋণের জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শাখা আবেদনকারীর তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করবে।
প্রাথমিক যাচাই শেষে আবেদনটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শাখায় অনুমোদনপত্র পাঠানো হবে।
তবে ঋণ অনুমোদনের পর অর্থ গ্রহণের সম্মতি জানাতে আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখায় সশরীরে উপস্থিত হতে হবে। অর্থাৎ আবেদন করার পুরো প্রক্রিয়ার জন্য শুরুতেই ব্যাংক শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
আবেদনকারী অনলাইনের মাধ্যমেই নিজের আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
ইতোমধ্যে ৪৮১ জন ঋণ পেয়েছেন
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ৪৮১ জনকে মোট ১৩ কোটি ৩ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে বিদেশে চাকরির আগে ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী কর্মীদের জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঋণের অর্থ ব্যবহারে থাকবে নজরদারি
ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে রাখা হয়েছে দুই স্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশালস প্রোগ্রাম বিভাগ এই তহবিলের কার্যক্রম তদারক করবে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভাষা ও দক্ষতার ঘাটতি অনেক সময় কর্মীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নতুন এই ঋণ সুবিধার মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যয় বহনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি আরও সহজ হতে পারে।
নোট: ঋণের শর্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদন প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হতে পারে। আবেদন করার আগে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।
Comments