বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে দ্রুত বিকাশমান সেমিকন্ডাক্টর ও ভিএলএসআই (VLSI) শিল্পে দক্ষ প্রকৌশলীর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তবে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এই ঘাটতি পূরণে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে উল্কাসেমি ভিএলএসআই ট্রেনিং ইন্সটিটিউট (ইউভিটিআই)।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউভিটিআই অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ। এর লক্ষ্য শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দেওয়া নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
ইন্ডাস্ট্রিমুখী কারিকুলামে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ
সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধাপকে কেন্দ্র করে ইউভিটিআইয়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সাজানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশেষায়িত বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে RTL Design, Design Verification, Physical Design বা PnR, Digital ও Analog Layout এবং Design for Testability (DFT)।
প্রতিটি কোর্স এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে একজন শিক্ষার্থী কেবল বইভিত্তিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।
বিশেষ করে চিপ ডিজাইন ও ভেরিফিকেশনের মতো জটিল ক্ষেত্রে বাস্তব প্রকল্পের পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা একজন নতুন প্রকৌশলীর ক্যারিয়ার শুরুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হাতে-কলমে প্রশিক্ষণে গুরুত্ব
ইউভিটিআইয়ের প্রশিক্ষণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া। প্রশিক্ষণের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সময় ইন্ডাস্ট্রি-স্ট্যান্ডার্ড EDA (Electronic Design Automation) টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
অভিজ্ঞ ইন্ডাস্ট্রি ইঞ্জিনিয়ারদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।
একটি সাধারণ কোর্স প্রায় তিন মাসব্যাপী হয়ে থাকে এবং সপ্তাহে পাঁচ দিন ক্লাস পরিচালিত হয়। কোর্সের ধরন ও বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে মোট প্রশিক্ষণ সময় প্রায় ২৪০ ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ৪৮০ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে।
চালু হয়েছে IC Mask Design ও Physical Design কোর্স
বর্তমানে ইউভিটিআইয়ে IC Mask Design এবং IC Physical Design বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। এই কোর্সগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আধুনিক ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বা আইসি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পর্কে ব্যবহারিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে Analog Design এবং Design Verification-এর মতো উচ্চতর ও বিশেষায়িত কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একসঙ্গে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান থেকে ইন্ডাস্ট্রি ক্যারিয়ারে সেতুবন্ধন
সেমিকন্ডাক্টর খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একাডেমিক জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। তবে চিপ ডিজাইন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, ভেরিফিকেশন বা লেআউটের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে সরাসরি চাকরিতে প্রবেশের জন্য আরও নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
এই জায়গাতেই শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাস্তব প্রকল্পের পরিবেশ, আধুনিক EDA টুলস এবং অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ একজন শিক্ষার্থীকে একাডেমিক পর্যায় থেকে পেশাদার কর্মপরিবেশে যাওয়ার প্রস্তুতি দিতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউভিটিআইয়ের মতো উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার মধ্যে থাকা দক্ষতার ব্যবধান কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আগামী দিনে বাড়তে পারে সেমিকন্ডাক্টর কর্মসংস্থান
বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে বাংলাদেশেও এই খাতে দক্ষ প্রকৌশলীর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আগামী পাঁচ বছরে দেশে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বর্তমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি উচ্চবেতনভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন দক্ষ ও শিল্প-প্রস্তুত মানবসম্পদ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি বিশেষায়িত সেমিকন্ডাক্টর প্রশিক্ষণ তরুণ প্রকৌশলীদের জন্য নতুন ক্যারিয়ার পথ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দেশের প্রযুক্তি ও রপ্তানি অর্থনীতির সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হলে দক্ষ জনবল তৈরির বিকল্প নেই। চিপ ডিজাইন থেকে শুরু করে ভেরিফিকেশন, লেআউট, ফিজিক্যাল ডিজাইন ও টেস্টিং—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষিত প্রকৌশলীর প্রয়োজন হবে।
এই বাস্তবতায় ইন্ডাস্ট্রি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক EDA টুলসের ব্যবহার এবং অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে হাতে-কলমে শিক্ষা বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউভিটিআইয়ের বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ কোর্স সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সেই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীরা যদি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারেও তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলে যেতে পারে।
Comments