দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষা শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাষা কেন্দ্র স্থাপন, প্রয়োজনীয় জনবল নির্ধারণ এবং ভাষা শিক্ষার কোর্স কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি ইউজিসিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ২৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা অংশ নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ভাষা নির্ধারণ
ইউজিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের তৃতীয় ভাষা চালু করা হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের চাহিদা, সম্ভাব্য কর্মসংস্থান এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুযোগ বিবেচনা করে ভাষা নির্বাচন করা হবে।
এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান সক্ষমতা ও অবকাঠামোর একটি রিসোর্স ম্যাপিং করা হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অন্যান্য জনবলের চাহিদা ইউজিসিকে জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলা হয়েছে।
ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের চাহিদাকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি)–এর তথ্য যাচাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ভাষার প্রয়োজন নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নন-ক্রেডিটের পাশাপাশি থাকবে ক্রেডিট কোর্স
তৃতীয় ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে শুধু স্বল্পমেয়াদি বা নন-ক্রেডিট কোর্সের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত একটি ভাষা ক্রেডিট কোর্স চালুর প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে একাডেমিক পড়াশোনার অংশ হিসেবে নতুন ভাষা শেখার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ চাকরি ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ভাষাগত দক্ষতা কাজে লাগাতে পারবেন।
বেকারদের জন্য ছয় মাসের ভাষা কোর্স
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চাকরিপ্রত্যাশী ও বেকারদের জন্যও ভাষা শিক্ষার সুযোগ তৈরির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে ছয় মাস মেয়াদি ভাষা কোর্স চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ভাষাশিক্ষক তৈরির পরিকল্পনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষায় নতুন সুযোগ
ইউজিসি মনে করছে, তৃতীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে, সেসব দেশের ভাষা শেখার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ভাষাগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ভাষা শেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। শিক্ষার্থীদের দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ভাষাগত দক্ষতার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাও উন্নত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে পুরো কার্যক্রমে শিক্ষার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যায়ক্রমে আরও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা
প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও মতবিনিময় করার পরিকল্পনা রয়েছে ইউজিসির।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের উচ্চশিক্ষায় ভাষা শিক্ষার নতুন একটি সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বিদেশে চাকরি, উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
Comments